পথশিশু ও দারিদ্র্য দূরীকরণ

পথশিশু ও দারিদ্র্য দূরীকরণ
Spread the love

সোনালী বাংলাঃ কিছু দিন আগে পত্রিকায় প্রকাশিত একটি রিপোর্টে দেখা যায়, বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। ‘পথশিশু’ অর্থ যাদের থাকার কোনো নির্দিষ্ট স্থান নেই। তাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব কারো ওপর নেই এবং তারা অভিভাবকহীন। রিপোর্ট মোতাবেক, ঢাকা শহরে এরকম পাঁচ লাখ পথশিশু আছে।
এ সংখ্যা অতিরিক্ত মনে হতে পারে। তবে কোনো সন্দেহ নেই যে, পথশিশুর সংখ্যা সারা দেশে অন্তত কয়েক লাখ এবং ঢাকায় অন্তত ৫০ হাজার।

এসব শিশু মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। মাদক ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়ছে। সর্বোপরি, বিভিন্ন ক্রাইম সিন্ডিকেট বা অপরাধী চক্র তাদের ‘রিক্রুট’ করছে। এরা বাধ্য হয়েই এসব অপরাধী চক্রে যোগদান করছে। এটি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ অবস্থা। যদি এত অধিকসংখ্যক শিশু শুধু ঢাকাতেই মাদকসেবী হয়ে যায় এবং নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে কী ভয়ঙ্কর অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে সরকার, এনজিও এবং সব সমাজসেবামূলক সংগঠনের অবিলম্বে এগিয়ে আসা উচিত। সরকারের উচিত এ ব্যাপারে একটি এনজিও কনসোর্টিয়াম (অনেক সংগঠনকে একত্র করা) গঠনে উৎসাহিত করা, যাতে তারা এ কাজ সারা দেশে, বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে শুরু করে দেন।

এ ব্যাপারে ছাত্র ও কিশোর সংগঠনগুলো বিশেষ উদ্যোগ নিতে পারে। তারা তাদের অফিসে ক্লাস নিতে পারে। গ্রামাঞ্চলে স্কুল ও মাদরাসায় এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে এ কথাও উল্লেখ করতে চাই, যারা এ ধরনের উদ্যোগ নেবেন তারা যেন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সহায়তা পান। নিকট অতীতে খবরে প্রকাশিত হয়েছে যে, পথশিশুদের নিয়ে কাজ করে, এমন এক এনজিওর অফিস থেকে একটি আইনশৃঙ্খলাবাহিনী শিশুপাচারকারী হওয়ার অভিযোগে ওই এনজিওর প্রধানকে (যিনি একজন এমবিবিএস ডাক্তার) গ্রেফতার করেছে। পত্রপত্রিকায় এ গ্রেফতার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যা-ই হোক, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দ্রুত ভালো করে খতিয়ে দেখা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে পথশিশু নিয়ে কাজ করছে এমন লোকেরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে না যান।

দারিদ্র্য দূরীকরণে সামগ্রিক পদক্ষেপ নিতে হবে

সম্প্রতি এক সেমিনারে দেশী-বিদেশী অর্থনীতিবিদ ও চিন্তাবিদরা বলেছেন, ‘দারিদ্র্য দূরীকরণে সামগ্রিক (ঐড়ষরংঃরপ) ব্যবস্থা নিতে হবে। কেউ কেউ বলছেন, দারিদ্র্য একটি রাজনৈতিক ইস্যু এবং এটা দূর করতে হলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা এবং ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। যুক্তরাজ্যের বাথ বিশ^বিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর জিওফ উড বলেন, দারিদ্র্য কেবল একটি টেকনিক্যাল ইস্যু নয়, এটা একটি রাজনৈতিক ইস্যুও। যদি এ দুটোকে আলাদা করে দেখা হয়, তাহলে কোনো কর্মসূচিই যথাযথ ফল দেবে না। সব পলিসি একত্রে দেখতে হবে এবং সমন্বিতভাবে কার্যকর করতে হবে। মাইক্রোফিন্যান্স বা ক্ষুদ্রঋণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর দ্বারা অতি দরিদ্রদের সমস্যার সমাধান করা যায় না। তারা বাদ পড়ে যায়। তার মতে, দারিদ্র্যবিমোচন নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। রাজনৈতিক অর্থনীতি (চড়ষরঃরপধষ ঊপড়হড়সু) দরিদ্র জনগণের স্বার্থের বিপক্ষে। ইউএনডিপির কিশোর সিং বলেন, গ্রামের দরিদ্রদের জন্য অনেক প্রোগ্রাম আছে। কিন্তু শহরের দরিদ্রদের জন্য প্রোগ্রাম নেই।’

দারিদ্র্য দূরীকরণে যে সামগ্রিক কর্মসূচি নিতে হবে, সে ব্যাপারে আমরা একমত। শহরের দরিদ্রদের বিষয়টিও এর অংশ হতে হবে। পথশিশুদের ব্যাপারটিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা এমনও মনে করি যে, কেবল মাইক্রোক্রেডিট কিংবা পুঁজিবাদী উন্নয়ন দ্বারা দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়। পুঁজিবাদ দারিদ্র্যবিমোচনের সহায়ক নয়, যেমন জিওফ উডও বলেছেন। আমরা লেইসেজ ফেয়ার (খধরংংবু-ভধরৎব বা যে অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে স্বাধীন এবং যেখানে কোনো হস্তক্ষেপ নেই) পুঁজিবাদ বা তাত্ত্বিক পুঁজিবাদ থেকে সুফল পাই না। আমাদেরকে এমন মার্কেট ব্যবস্থা নিতে হবে, যেখানে তাত্ত্বিকভাবে প্রয়োজনীয় সরকারি হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ স্বীকৃত। ইসলামের পরিভাষায় একে ‘হিসবা’ বলা হয়। হিসবা অর্থ হলো, অর্থনীতিতে সরকার কর্তৃক প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করা। তেমনি অতি দরিদ্রদের জন্য সরকারিভাবে সুদবিহীন মাইক্রোফিন্যান্স চালু করতে হবে, যেমন ইরান সরকার করেছে। পুঁজিবাদ বা সমাজবাদ দিয়ে দারিদ্র্য দূর হয়নি। একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রেই অতীতে দারিদ্র্য দূর হয়েছিল। ইসলামী রাষ্ট্রের পদ্ধতি হচ্ছে, সরকার অসহায়দের দায়িত্ব নেবে। এটা নানা পদ্ধতিতে করতে হবে। যেমন : অসহায় ভাতা, বেকার ভাতা ইত্যাদি। সবার প্রতি সুবিচার এবং আর্থিক সমস্যার সমাধান হবে অর্থনীতির মূল মূল্যবোধ; মুনাফার পূজা নয়। সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রচলিত যেসব ব্যবস্থা রয়েছে, তাও ব্যবহার করে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের অব্যাহত উন্নয়নের ব্যবস্থা করতে হবে। 


লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *