শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও নীতিমালা সংশোধন প্রয়োজন।

Spread the love

সোনালীবাংলাঃ২০১৮ সালের এমপিও নীতিমালা ও জনবল কাঠামোতে সংশোধনী এনে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ)-এর জনবল কাঠামো ও নীতিমালা-২০২১’-এর খসড়া চূড়ান্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছে। খসড়া নীতিমালায় এমপিও প্রদানের শর্তাদি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘আগের এমপিও নীতিমালায় কিছু অসংগতি ছিল। আশা করি, নীতিমালা ও জনবল কাঠামোর অসংগতি দূর হবে।’ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানবান্ধব নীতিমালা সবার কাম্য। যাতে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে ভোগান্তি ও দীর্ঘসূত্রতা দূর হয়।

২০১৮-র এমপিও নীতিমালায় কোনো প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হতে চারটি ক্ষেত্রে সূচকের মান পূরণের শর্ত ছিল। এগুলো হচ্ছে- একাডেমিক স্বীকৃতি, শিক্ষার্থী সংখ্যা, পাবলিক পরীক্ষায় পরীক্ষার্থী এবং উত্তীর্ণের সংখ্যা। খসড়া নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে একাডেমিক স্বীকৃতি বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে কি স্বীকৃতি ছাড়াই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হবে?

আমরা মনে করি, স্বীকৃতির শর্ত বাদ দেওয়া সমীচীন হবে না। স্বীকৃতি প্রাপ্তির ভেতর দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের বয়স জানা যায়। স্বীকৃতির সময় একটি প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় তথ্য যাচাই করা হয়। এর ভেতর থাকে প্রতিষ্ঠানের জমির দাগ-খতিয়ান, হাল নাগাদ জমির খাজনা পরিশোধের রসিদ, শ্রেণিওয়ারি শিক্ষার্থী, কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীর তালিকা, ম্যানেজিং কমিটি, তিন বছরের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল, সাধারণ ও সংরক্ষিত তহবিলের হিসাব, অডিট রিপোর্ট ইত্যাদি। এসব তথ্যের ভেতর দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির স্বরূপ প্রকাশিত হয়।

সাধারণত স্বীকৃতির মেয়াদ থাকে তিন বছর। এরপর আবার স্বীকৃতি নবায়ন করতে হয়। এমপিও প্রত্যাশী একটি বড় সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতির মেয়াদ ১৫-২০ বছর পেরিয়ে গেছে। স্বীকৃতির আগে আরও ২-৩ বছর পাঠদানের অনুমতিকাল পার করতে হয়েছে। ২০১৮ সালের এমপিও নীতিমালার ২২ নম্বর ধারায় শিক্ষায় অনগ্রসর, ভৌগোলিকভাবে অসুবিধাজনক, পাহাড়ি এলাকা, হাওড়-বাঁওড়, চরাঞ্চল, নারী শিক্ষা, সামাজিকভাবে অনগ্রসর গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় এমপিওভুক্তির শর্ত শিথিলের প্রস্তাব ছিল।

অনুরূপভাবে ২০ বছরের অধিক বয়সি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠতাকেও বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে একটি ধারা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে; যাতে পুরনো প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে না পড়ে, শুকিয়ে না মরে। ২০১৮ সালে এমপিও নীতিমালা প্রকাশের পর আবেদন চাওয়া হলে সাড়ে ৯ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবেদন করে। নীতিমালার মানদণ্ডে ২ হাজার ৭৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়। এর ভেতর নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১ হাজার ৪২৮টি।

অন্যগুলোর স্তর পরিবর্তন। দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নন-এমপিও থেকে যায়। মুজিববর্ষের পরও বছরের পর বছর নন-এমপিও সমস্যা বিরাজ করা কাম্য হতে পারে না।

২০১৮-র নীতিমালার ২(খ) ধারায় উল্লেখ ছিল- প্রস্তাবিত এমপিও নীতিমালা অনুমোদন লাভ করলে বর্তমানে অনুমোদিত সব স্কুল-কলেজের ভৌগোলিক দূরত্বভিত্তিক ম্যাপিং করা যেতে পারে। উক্ত ম্যাপিং অনুযায়ী একই ভৌগোলিক দূরত্বে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলে তা প্রশাসনিকভাবে একীভূত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। (পূর্ববর্তী একাধিক স্কুল ভবন/কাঠামো একীভূত স্কুলের বিভিন্ন ক্যাম্পাস হিসাবে বিবেচিত হবে)। এ ধারা অনুসরণ করে একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে এমপিও সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান হতে পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রুগ্ন হওয়ার দায় কেবল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী ও ম্যানেজিং কমিটির নয়; শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপরও এর দায় বর্তায়। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভালোভাবে চলার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক দক্ষ শিক্ষক এবং অবকাঠামো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৫ সাল থেকে এমপিও, নন-এমপিও নির্বিশেষে সব স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এনটিআরসিএ থেকে নিবন্ধিত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার বিধান করা হয়েছে।

নিবন্ধিত শিক্ষকরা নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে আগ্রহী হন না। দূর থেকে আগত কোনো নিবন্ধিত শিক্ষক বিনা বেতন দু’এক বছর চাকরি করার পর জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। ফলে অনেক নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক স্বল্পতায় ভুগছে। আর অধিকাংশ নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো প্রতিষ্ঠালগ্নের টিনের চালার আধাপাকা ভবনে চলছে। এসব ভবন নড়বড়ে হয়ে গেছে। ফলে শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করতে পারছে না।

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশপাশের এলাকার শিক্ষার্থীরা পড়বে- এ ধারণা থেকে প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সময় ক্যাচমেন্ট এলাকার জনসংখ্যার সনদ দাখিল করতে হয়। শিক্ষক স্বল্পতা এবং দুর্বল অবকাঠামো থাকলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে চায় না। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী স্বল্পতা দেখা দেয়। এ কারণে শিক্ষার্থীরা যাতে নিকটবর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সে নির্দেশনা থাকা দরকার।

আবার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম শিক্ষার্থী নির্ধারণ করা হলেও সর্বোচ্চ শিক্ষার্থী নির্ধারণ করা হয় না। প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করে- এটিও নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী স্বল্পতায় ভোগার অন্যতম কারণ। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ কী সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করবে, সেই সংখ্যাও নির্ধারণ করা সংগত।

সংশোধিত নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিভুক্তির ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও মফস্বল এ তিন এলাকায় বিভক্ত করা হয়েছে। জেলায় অবস্থিত পৌরসভার সঙ্গে উপজেলার পৌরসভার শহরায়নে পার্থক্য রয়েছে। বেশিরভাগ উপজেলাধীন পৌরসভার প্রান্তে অবস্থিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক রকম গ্রামেই অবস্থিত। এ ক্ষেত্রে এমপিও নির্বাচক মানদণ্ড কিছুটা সহজ হওয়া দরকার।

একটি দাখিল মাদ্রাসা প্রথম থেকে দশম শ্রেণি একবারে এমপিওভুক্ত হয়। অথচ একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়-নিুমাধ্যমিক স্তরে (ষষ্ঠ-৮ম) একবার ও মাধ্যমিক স্তরে (৯ম-১০ম) আরেকবার এমপিওভুক্ত করা হয়। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাধ্যমিক হিসাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হলে একবারে এমপিওভুক্ত করা উচিত। তাছাড়া নিুমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যাও বেশি নয়। ২০১৮ সালের নীতিমালায় নিুমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী ১৮ জন আর মাধ্যমিকে ২২ জন।

২০১৮ নীতিমালায় সহশিক্ষা ও শুধু বালক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বালিকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাম্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা কম করা হয়েছিল। সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্টে এ প্রসঙ্গে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। হাইস্কুলের ওপরের ক্লাসে এবং কলেজপড়ুয়া ছাত্রীদের বাল্যবিবাহ একটি বড় সমস্যা। এ কারণে বালিকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে থাকে। এ বাস্তবতায় বালিকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাম্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা কম থাকা সংগত।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও প্রত্যাশীদের মনে জিজ্ঞাসা- ২০১৮ সালের সূচকে তিন বছরের তথ্য গড় করা হয়েছিল; এবারও কি তিন বছরের তথ্য গড় করা হবে, নাকি কেবল সর্বশেষ বছরের তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হবে? উচ্চমাধ্যমিকে শহর এলাকায় বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্যিক বিভাগে পৃথকভাবে ৪৫ জন এবং মফস্বলে পৃথকভাবে ৪০ জন শিক্ষার্থী থাকার শর্ত দেওয়া হয়েছে। মফস্বলের হাইস্কুলে খুব কমসংখ্যক শিক্ষার্থী বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে।

সাধারণত মেধাবীরা বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়। এসএসসি পাশ করে তাদের শহরের নামি কোনো কলেজে ভর্তি হওয়ার ঝোঁক থাকে। ফলে মফস্বলের কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ৪০ জন শিক্ষার্থী পাওয়া কঠিন। এখন একটি কলেজে এক বা দুই বিভাগে কাম্য শিক্ষার্থী থাকলে ওই অংশে এমপিওভুক্ত হতে পারবে, নাকি নন-এমপিওই রয়ে যাবে?

২০১৯ সালে নতুন এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশের অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী প্রতি বছর এমপিওভুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এরপর এক বছর পেরিয়ে গেছে। এখনো এমপিও নীতিমালা চূড়ান্তকরণ ও এমপিওর আবেদন চাওয়া হয়নি। নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের চাওয়া- চলতি মাসে শিক্ষাবান্ধব নীতিমালা প্রকাশ করে চলতি অর্থবছরেই যেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়।

শরীফুজ্জামান আগা খান : আহ্বায়ক, নন-এমপিও নিুমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষক-কর্মচারী পরিষদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *