করোনার প্রভাব: মাস্কসহ হ্যান্ড স্যানিটাইজারের কৃত্রিম সংকট

করোনার প্রভাব: মাস্কসহ হ্যান্ড স্যানিটাইজারের কৃত্রিম সংকট
Spread the love

সোনালী বাংলা ঃদেশে করোনাভাইরাস শনাক্তের খবর প্রকাশের পর এ সংক্রান্ত মেডিকেলসামগ্রীর চাহিদা বেড়ে গেছে। আর এর সুযোগ নিচ্ছেন বিক্রেতারা। তারা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এসব পণ্য কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করছেন। দোকানে ২০ টাকার মাস্ক বিক্রি হচ্ছে ২শ’ টাকায়।

আর হ্যান্ডওয়াশতো উধাও হয়ে গেছে। রোববার রাত থেকে রাজধানীর বিভিন্ন ফার্মেসি এবং সুপার শপ ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, কেউ বাড়তি দাম নিলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাঠে নামছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মনিটরিং টিম। অন্যদিকে নিত্যপণ্যের বাজারেও চাহিদা বেড়েছে। সংকটের আশঙ্কায় পণ্য মজুদ করছেন ক্রেতারা। এতে দাম বৃদ্ধির শঙ্কাও রয়েছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বিভিন্ন ওষুধের দোকানে রোববার বিভিন্ন ধরনের তরল হ্যান্ডওয়াশ ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়। কিন্তু সোমবার সেগুলো বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। দুপুরের পর ওষুধের দোকানগুলোতে হ্যান্ডওয়াশ পাওয়া যায়নি।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কার্যকর সার্জিক্যাল মাস্ক। এগুলো আগে বিক্রি হয়েছে ৮০ থেকে ১২০ টাকা করে। সোমবার বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা করে। রোববার রাতে মাস্ক ও হ্যান্ডওয়াশ কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়েন মুজিবুর রহমান।

তিনি বলেন, ‘এলিফ্যান্ট রোড, শাহবাগ ও বসুন্ধরা এলাকায় খুঁজেও হ্যান্ডওয়াশ পাইনি। পরে একটি দোকানে পেয়েছি। এলিফ্যান্ট রোড থেকে ৫০ টাকার মাস্ক কিনেছি ১০০ টাকায়।’

এছাড়া জীবানুনাশক বিভিন্ন ওষুধের দামও বেড়ে গেছে। বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির তৈরি জীবাণুনাশক স্যাভলনের চাহিদা বাড়ার কারণে দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি সংকটও তৈরি হয়েছে। অনেক ফার্মেসিতে এগুলো পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে ওষুধ প্রশাসন থেকে বিভিন্ন ধরনের হ্যান্ডওয়াশের দাম বেঁধে দেয়া হয়েছে। এগুলো তদারকি করার জন্য সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এর অংশ হিসেবে প্রশাসন বিভিন্ন স্তরে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্য রাখার দায়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা করেছে।

বেড়েছে নিত্যপণ্যের চাহিদা : রাজধানীর নয়াবাজার, কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, করোনাভাইরাসের ভয়ে ভোক্তারা খাদ্য পণ্য থেকে শুরু করে স্যানিটারি পণ্য কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন।

সকাল ১০টার দিকে নয়াবাজারের তুহিন স্টোরের সামনে দাঁড়াতেই হুসনেআরা বেগম নামের এক ক্রেতা দোকানের বিক্রেতার কাছে ৩ প্যাকেট (এক কেজি সমমান) গুঁড়াদুধ, ৫ কেজি চিনি, ৫ কেজি আটা, ২ কেজি লবণ, বোতলজাত ৫ লিটারে দুটি সয়াবিনের বোতল, ৫টা হ্যান্ড টিস্যুর প্যাকেট নিয়ে টাকা পরিশোধ করছেন।

এ সময় তিনি যুগান্তরকে জানান, দেশে করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে। তাই সব সময় বাইরে যাতে বের হতে না হয় এজন্য পুরো এক মাসের খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী কিনে বাড়ি যাব। যাতে বারবার মানুষের ভিড়ে না আসতে হয়।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কারওয়ান বাজারের পেঁয়াজের আড়তে গিয়ে দেখা গেছে, সাহাবুদ্দিন নামের এক ক্রেতা ৪১ নয় আড়ত থেকে ১০ কেজি পেঁয়াজ কিনছেন। তার সঙ্গে আসা বোনের ছেলেকে পাঠিয়েছে ৫ কেজি রসুন ও ৫ কেজি আদা কিনতে।

তিনি বলেন, মানুষের মনে ভয় বিরাজ করছে। কারণ সরকার থেকে বলা হয়েছে জনসমাগমে বেশি না যেতে। তাই বারবার যাতে বাজারে না আসতে হয়, এজন্য বেশি করে পণ্য কিনছি।

কারওয়ান বাজারের পেঁয়াজ বিক্রেতা মো. আশরাফ যুগান্তরকে বলেন, মানুষ সব হুজুগে চলে। দেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই তারা বেশি করে পণ্য কিনে নিয়ে যাচ্ছে।

এতে দেখা যাবে চাহিদার চাইতে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি থাকবে। আর এ সুযোগে মোকামে দাম বাড়িয়ে দেবে। ফলে পাইকারি ও খুচরা বাজারেও দাম বাড়বে। এটা সাধারণ ক্রেতাদের বোঝা উচিত।

জানতে চাইলে ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান যুগান্তরকে বলেন, ভোক্তাকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যে, তাদের কারণে যেন পণ্যের দাম না বাড়ে। কেউ যাতে ১০ দিনের পণ্য একদিনে ক্রয় না করেন। এতে বাজারে বাড়তি চাহিদার সৃষ্টি হবে। আর এ সুযোগে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়াবেন। ব্যবসায়ীদের এ সুযোগ দেয়া যাবে না।

তিনি আরও বলেন, সরকারি তদারকি সংস্থাকেও সজাগ থাকতে হবে। যাতে করোনাভাইরাসের প্রভাব দেখিয়ে কেউ অসাধু পন্থায় ভোক্তার পকেট কাটতে না পারে। আর এমনটা হলে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার যুগান্তরকে বলেন, করোনার প্রভাবে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মাস্কসহ অন্যান্য মেডিকেল পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

এ কারণে অধিদফতরের পক্ষ থেকে ৫টি টিম নামানো হয়েছে। যাতে কেউ ১০ টাকার মাস্ক ৫০ টাকা ও ৩০ টাকার মাস্ক ১০০-১৫০ টাকায় বিক্রি করতে না পারে। এছাড়া কাঁচাবাজারেও আমাদের তদারকি অব্যহত রেখেছি। সামনে স্পেশাল সেল করে আরও জোরদার করা হবে।

যাতে করোনার প্রভাবকে ইস্যু করে কেউ খাদ্যপণ্যের দাম বাড়াতে না পারে। যদি কেউ অসাধু পন্ধায় ভোক্তাদের জিম্মি করে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রয়োজনে জরিমানার সঙ্গে প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার পাশাপাশি কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।

দুই ফার্মেসি সিলগালা : মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে বিক্রি করায় গুলশানে দুই ফার্মেসি সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। সোমবার রাজধানীর গুলশানে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ফার্মেসি দুটি সিলগালা করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।

প্রতিষ্ঠানগুলো হল- আল নূর ফার্মেসি ও সাফাবি ফার্মেসি। এছাড়া তদারকিকালে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির অপরাধে আল মদিনা ফার্মেসিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

সিলেটে ৬ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা : সিলেট ব্যুরো জানায়, নগরীর জিন্দাবাজার এলাকায় অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। অভিযানে মাস্কের অতিরিক্ত মূল্য রাখার দায়ে ৬ প্রতিষ্ঠানকে ৩১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সোমবার সকালে অভিযান চালানো হয়।

জনসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস আতঙ্ককে পুঁজি করে রোববার সন্ধ্যার পর থেকেই বেপোরোয়াভাবে মাস্কের দাম বাড়াতে থাকেন ফার্মেসি ও সার্জারি পণ্য বিক্রির ব্যবসায়ীরা।

খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবেই ভোক্তা অধিদফতরের টিম নগরীর বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মাস্কের মূল্য না বাড়ানোর বিষয়ে সতর্কতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে। তবে সোমবার সকাল থেকে আবারও অতিরিক্ত দামে মাস্ক বিক্রি শুরু করে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এ কারণেই অভিযান চালানো হয়।

যশোরে মাস্কের দাম চড়া : যশোর ব্যুরো জানায়, যশোরে হঠাৎ করে মাস্কের চাহিদা বেড়ে গেছে। আর এ সুযোগে বিক্রেতারা দামও বাড়িয়ে দিয়েছেন। সোমবার যশোর শহরের ফার্মেসিগুলোতে ৪ টাকার মাস্ক ২০-২৫ টাকা ও উন্নতমানের ২৫-৩০ টাকার মাস্ক ৮০ টাকায় বিক্রি হয়।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক ওয়ালিদ বিন হাবিব জানান, যদি কেউ মাস্কের দাম বেশি রাখে, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কুমিল্লায় বিভিন্ন দোকানে অভিযান : কুমিল্লা ব্যুরো জানায়, অতিরিক্ত দামে মাস্ক বিক্রির অভিযোগে কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন দোকানে অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদফতর। সোমবার বিকালে নগরীর কান্দিরপাড় ও বাদুরতলা এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *